ABOUT US PUBLICATIONS EBOOKS EBOOKS PUBLISH WITH US OUR AUTHORS MEDIA REVIEW FOR BOOKSTORES CONTACT US

Search Books

 

Dharmer Manush Manusher Dharma by Amiya Bandyopadhyay

অতি সাধারণ মানুষও কোনো‍-না কোনো ভাবে নিজেকে নিরন্তর খুঁজে চলেছে। তার সামনে বস্তু-সত্য, ভাব-সত্য এবং দার্শনিক-সত্য নিত্য উদ্ভাসিত। সে সব সময়েই তার গভীর গোপন আপনটাকে বাইরের জগতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে চায়; জানতে চায় মিল-অমিলের জায়গাগুলি। সে যখন বুঝতে পারে‍—‍‍এই প্রকৃতি জীবজগৎ ও বস্তু জগতের মধ্যেই তার নিজের জায়গাটির হদিস পাওয়া যাবে, তখন তার খোঁজ নূতন মাত্রা পায়। দৃষ্টি-দীপের আলোয় সৃষ্টির আনন্দে তখন সে নিজেকে উন্মোচিত করার এক আশ্চর্য শক্তি পায়। এই উন্মোচনের দায় ও দায়িত্ব অনেক। কারণ তা এক থেকে বহুতে ব্যাপ্ত হওয়ার দাবি রাখে। লেখালিখির মধ্যে যারা আছেন, তাঁরা কেন লেখেন‍—‍এই প্রশ্নের উত্তর নিজের নিজের মতো করে দিয়ে যাচ্ছেন। আমার নিজের উত্তর হল‍—আমিত্ব প্রকাশের সুখ; নিজের আনন্দ ও সৌন্দর্যানুভূতি সকলের মধ্যে সঞ্চারিত করার আত্যন্তিক আগ্রহ; চলমান জীবনে সমগ্রের খোঁজ করতে গিয়ে ফেলে আসা অতীতকে বারবার ফিরে দেখার তীব্র ইচ্ছা; বর্তমানের সঙ্গে অতীতের সম্পর্কের অনুধাবন করে নিজের অবস্থানটিকে সঠিকভাবে জানার টানেই আমি লিখি।

গবেষণা-ধর্মী লেখার কাজে এগিয়ে যেতে হলে প্রভূত সাহায্য, সহযোগিতা ও তালিমের প্রয়োজন হয়। সেখানেও সীমাবদ্ধতা অপ্রতুল নয়। অথচ গুরুর কৃপাতেই পঙ্গু গিরি লঙ্ঘন করার শক্তি লাভ করে। অন্যদিকে ব্রাত্যজনের বেদনা প্রায়শই আচার্যের অনুকম্পা লাভ করে না। আবার এমন আচার্যও দুর্লভ নন, যিনি অনুসন্ধিৎসুকে উৎসাহ দান করেন শুধু নয়, সময়োচিত সাহায্য সহযোগিতা দিয়ে তাকে তার অভীষ্ট অর্জনের পথে এগিয়ে দেন। এই উৎসাহ উদ্দীপনা ও অনুপ্রেরণা যিনি আমৃত্যু আমাকে দান করেছিলেন, তিনি আমার পিতৃদেব প্রয়াত প্রমথনাথ বন্দ্যাপাধ্যায়। পরবর্তীকালে কর্মজীবনে আমার ভাবনা-চিন্তার ভিত নূতন করে গড়ে দিয়েছিলেন ডার্মস্টাড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক প্রফেসর ড. জেরহার্ড ফাবের, ড. হ্যান্স ওটো ভেসপার, ডাইরেক্টর, মিনিস্ট্রি অব এডুকেশন হেসে (Hesse), জার্মান সরকার; বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. হেলমুট যুঙ্গারম্যান। তাঁদের সংস্পর্শে এসে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি-উৎপাদনের আলোকে প্রশিক্ষণ পেয়ে নিজেকে ও বিশ্বকে নূতন করে জানতে বিপুলভাবে উৎসাহী হলাম এবং স্বদেশ-বিদেশ আত্মপর ভেদাভেদ তুচ্ছ করে নিজেকে ও বিশ্বকে নূতন করে ভাবতে শিখলাম। সব কিছুর মধ্যেই অনুভব করলাম অফুরন্ত জীবন। সাহিত্য চর্চার কৌতূহল কিশোর বয়স থেকেই ছিল। প্রযুক্তি-পাঁজর ভেদ করে ভিতরটাকে জটিল করে তুলতে পারেনি। সাহিত্যসৃষ্টি ও গবেষণার কাজ যে সহজ নয়, তা-ও নূতন করে বুঝতে পারলাম। কিন্তু যার ফললাভের উচ্চাকাঙ্ক্ষা নেই, তার বড়ো সুবিধা­‍—তাকে আত্মপ্রতিষ্ঠার ব্যাধিতে আক্রান্ত হতে হয় না। শ্রদ্ধাবনত চিত্তে সেই ভালোবাসাকে মূলধন করে আত্মবিশ্বাসের উপর ভর দিয়ে সবরকম দুর্বলতা নিয়েই সে আত্মজিজ্ঞাসার জগতে প্রবেশ করতে পারে।

কর্মজগৎ থেকে অবসর পাওয়ার পর নূতন করে লেখার জগতে প্রবেশ করে দেখলাম, মানবজমিন কোথাও অনাবাদি বা পতিত পড়ে নেই। কর্ষণের দাগ সর্বত্রই সুস্পষ্ট। তবু যা একবার শুরু  হয়েছে তা কখনও শেষ হয় না‍— অবিচ্ছিন্নভাবে শাখাপ্রশাখায় তার বিস্তার চলতেই থাকে। আর থাকে বলেই পূর্ববর্তীদের পথ অনুসরণ করেই পরবর্তীজনেরা এগিয়ে যেতে পারে। মূল সমস্যা হল মানুষকে নিয়ে। বর্তমান গ্রন্থে এই মৌলিক সমস্যাটি আমি আমার মতো করে বুঝতে চেষ্টা করেছি।

মানুষ কেন মানুষকে দেখে ভয় পাচ্ছে? রোরুদ্যমানা প্রকৃতি জননীর কান্নার শব্দ কেন কেউই শুনতে চাইছে না? চারদিকে শুধু তথাকথিত ধর্মের মানুষ, আধ্যাত্মিক মানুষ কোথায়? অথচ দর্শন, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি সবই আছে এবং এগিয়ে চলেছে। তবে কী নেই, যার অভাবে এত সংঘাত, এত দ্রোহ, যুদ্ধ ধ্বংস, এত মৃত্যু? সর্বোপরি এত অবিশ্বাস!

অন্তহীন জিজ্ঞাসা বুকে নিয়ে ধর্মের মানুষ ও মানুষের ধর্মের অবস্থান ও অভিমুখ খোঁজার কাজ শুরু করলাম। এই কঠিন কাজে লক্ষ্যভ্রষ্ট ও সত্যভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা ষোলো আনা। ‘ধর্মের মানুষ, মানুষের ধর্ম’ রচনাটির কাজে হাত দিয়ে সারা পৃথিবীতে যাঁরা মানব অস্তিত্বের নানাক্ষেত্রে মনীষার সাক্ষর রেখে গিয়েছেন, গ্রন্থের প্রয়োজনে তাঁদের কাউকে কাউকে স্মরণ করে আহরণ করেছি নানা তথ্য, যা এই গ্রন্থের মূল উপজীব্য হয়ে উঠেছে। সেই সব মনীষীদের কাছে আমার ঋণ অপরিশোধ্য হয়ে রইল। তাঁদের অবদানগুলি প্রয়োজন মতো গ্রন্থভুক্ত করতে গিয়ে সংগ্রহের ভালোমন্দ দোষগুণ বিচারে ত্রুটি থাকলে তা আমার অজ্ঞানতার কারণেই ঘটেছে।

গ্রন্থটির নির্দেশিকা রচনা করে দিয়েছেন অধ্যাপিকা ড‍· শুক্লা দত্ত। নিত্য উৎসাহদানের মধ্য দিয়ে তিনি আমার সারস্বত অনুসন্ধিৎসাকে পুষ্টি দান করে চলেছেন। তাঁর কাছে আমি চিরঋণী। সারথি সম্পাদক, পুত্রপ্রতিম শ্রীমান বাসুদেব ঘোষ আমার সৃষ্টিকর্মে সর্বক্ষণের সঙ্গী ও প্রেরণা। বৈদগ্ধ্যে দীপ্ত পণ্ডিত সুলেখক, গবেষক ও প্রকাশক ড· শিশিরকুমার মাইতিকে পাণ্ডুলিপিটি পড়তে দিয়েছিলাম। তাঁকে অশেষ শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ জানাই। প্রতিভাবান তরুণ শিল্পী ও ভাস্কর শ্রীমান ধ্রুব ঘোষ গ্রন্থটির প্রচ্ছদ রচনা করে দিয়েছেন। তাঁকে বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানাই।

প্রণিপাতের মধ্য দিয়ে পরিগ্রহণের যাবতীয় ঋণ শ্রদ্ধার সঙ্গে স্বীকার করে গ্রন্থখানি যাঁর করকমলে নিবেদন করলাম, তিনি আমার সর্বক্ষণের প্রেরণাদাতা ড· অলোক রায়। তিনি যদি গ্রন্থখানি গ্রহণযোগ্য মনে করে গ্রহণ করেন এবং পাঠকগণ যদি পাঠ করে পরিপ্রশ্নে ও প্রতিপ্রশ্নে প্রাণিত হন, তবে জানব, আমার কঠিন শ্রম ও প্রচেষ্টা সার্থক হয়েছে। পরিশেষে, সাধুবাদ জানাই প্রখ্যাত প্লাস্টিক সার্জন ও সুপ্রতিষ্ঠিত লেখক ডাঃ অনিরুদ্ধ বসুকে। গ্রন্থটি প্রকাশে তিনি যে আত্যন্তিক আগ্রহ ও আন্তরিকতা প্রকাশ করেছেন, তার জন্যে আমি কৃতার্থ ও ধন্য। তাঁরই আগ্রহে বইটি প্রকাশে নিঃশর্তে এগিয়ে এসেছেন স্মৃতি প্রকাশনার প্রাণশক্তি শ্রীমতী স্মৃতি বসু। তাঁকে আমার আন্তরিক প্রীতি ও শুভেচ্ছা জানাই। সঞ্জয় ঘোষাল গ্রন্থটির বর্ণবিন্যাস ও প্রুফ কারেকশন-সহ সৌকর্য-রক্ষার সব দায়িত্ব গ্রহণ করে আমাকে বাধিত করেছেন। তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ। অভিজিৎ মুখোপাধ্যায় বিশেষ সহযোগিতা করেছেন, তার প্রতিও রইল কৃতজ্ঞতা।
                                                                                                 

অমিয় বন্দ্যোপাধ্যায় 



Dharmer Manush Manusher Dharma

Find us on facebookNon-Fiction, Bengali
Hardbound, 335 pages, 800 gms
Price: Rs 500/- US $20/-

Keywords: dharma, manush, amiya, Bandyopadhyay, research

eBook
googlebook
kobo

 

 

Publications of Amiya Bandyopadhyay:

- Dharmer Manush Manusher Dharma eBook googlebook

 

Reviews

ধর্মের মানুষ, মানুষের ধর্ম পরিচিন্তন

- অলোক রায়

নিজেকে নিরন্তর খুঁজতে খুঁজতে নিজের পরিবেশ পরিজনকে খোঁজা শুরু হয়। আর তাই থেকেই আত্মজগৎ ও বিশ্বজগতের সম্পর্ক নির্ধারণের আগ্রহ জাগে। মানুষ মানুষের জন্য‍—তা আমরা জানি। তবু মানুষের মধ্যে বিভেদ-বিভ্রান্তির অন্ত নেই। বিশেষত একুশ শতকের প্রথম দশকে হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বী যেন আগের সব ধ্বংসোন্মাদনাকে ছাপিয়ে গেছে। শ্রী অমিয় বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যত কবি, তবে জ্ঞানচর্চায় নিযুক্ত থাকায় তাঁর যাবতীয় রচনায় মনীষার পরিচয় সেই উপলব্ধির জগৎকে একই সঙ্গে গভীরতা ও বিস্তার দেয়। এই ব্রহ্মাণ্ডে আমাদের অবস্থান নিয়ে তাঁর মনে অনেক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। স্বদেশে ও বিদেশে যাঁরা যথার্থ মুনি, অথবা যাঁরা কবির্মনীষী, তাঁরা ধর্ম ও দর্শন নিয়ে যা ভেবেছেন, তার সঙ্গে শ্রী অমিয় বন্দ্যোপাধ্যায় ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত। তবে তিনি একালের মানুষ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যায় তাঁর বিশেষ অধিকারের পরিচয় মেলে নিবন্ধের পাতায় পাতায়। আসলে দার্শনিক বা বিজ্ঞানী বলে কোনো স্বতন্ত্র ভাগ করা যায় না, উচিতও নয়। জগদীশচন্দ্র বসু বা আইনস্টাইনের শিক্ষাদীক্ষা সন্ধানের জগৎ স্বতন্ত্র, কিন্তু ধর্ম ও দর্শনের চর্চা তাঁদের মধ্যে সম্ভবত কোনো বিরোধের সৃষ্টি করেনি। ভূমিকায় রচয়িতা তাঁর লেখালিখির কারণ সন্ধানে শেষ যে সূত্রটির কথা বলেন তা তাঁর সম্বন্ধে অবশ্যমান্য, অর্থাৎ ‍‘বর্তমানের সঙ্গে অতীতের সম্পর্ককে অনুধাবন করে নিজের অবস্থানটিকে সঠিকভাবে জানা‍’ তাঁর উদ্দেশ্য।

বিন্দুতে সিন্ধুদর্শনের মতো সভ্যতার আদিগন্ত বিস্তারকে স্বল্প পরিসর আলোচনার মধ্যে হয়তো ধরা সম্ভব নয়। তবে শ্রী অমিয় বন্দ্যোপাধ্যায় একভাবে সে চেষ্টা করেছেন। জীবজগতে অভিব্যক্তির স্তরগুলি সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করলে বোঝা যাবে, মানুষ এই চৈতন্যময় স্তরে বিবর্তনের কতখানি পথ অতিক্রম করে তবে বর্তমান অবস্থায় পৌঁছুতে সক্ষম হয়েছে। সাড়ে চারশো কোটি বছর আগে থেকে চল্লিশ হাজার বছরে‍— জীবজগতের আদি সৃষ্টি থেকে আধুনিক মানুষের বর্তমান পরিণতি‍— এই দীর্ঘ পথ পরিক্রমার ইতিহাস পরম কৌতূহলের বস্তু। জীবজগতের জন্ম থেকে বিবর্তনের পথে সভ্যতার উন্মেষ, তারপর সভ্যতার বিবর্তন। সেই পথেই একদিন ধর্মের জন্ম‍— মানবজীবনে সত্যের আকুতি পরিণত হয় ধর্মের আকুতিতে। তবে আত্মধ্বংসী মানুষ অনেক সময় এগোতে গিয়ে পিছিয়েছে। সভ্যতা তাই একই সঙ্গে কখনও প্রগতিমুখী, আবার কখনও প্রত্যাবর্তী। খুব ব্যাপক অর্থে ধর্ম বা রিলিজিয়নকে গ্রহণ করলে তার মধ্যে কোথাও কোনো বিরোধ বা পিছুটান দেখা যায় না। Essentials of Religion  অর্থাৎ সত্য বলা, সৎ পথে চলা এবং Philosophy of Religion অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যু-জীবন নিয়ে দার্শনিক ভাবনা সব ধর্মেই মোটামুটি এক‍— এই ধর্মই সভ্যতাকে এগিয়ে নিয়ে চলে। তবে Rituals of Religion দেশভেদে, সম্প্রদায়ভেদে, এমনকী কালভেদে স্বতন্ত্র। আসলে ধর্ম নিয়ে কোনো বিরোধ নেই, যা কিছু বিভেদ বিদ্বেষ ধর্মাচার/ ধর্মতন্ত্র/ ধার্মিকতা নিয়ে।

আদিযুগে পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে ধর্মীয় বিশ্বাসের নাম ও রূপ-বৈচিত্র দেখা যায়। মিশরে কিংবা ইন্দোনেশিয়ায়, গ্রিস কিংবা স্ক্যানডিনেভিয়ায়, মেসোপটেমিয়া বা পূর্বপ্রাচ্যে‍— সর্বত্র চলছে ধর্মের সঙ্গে প্রবৃত্তির বিরোধ। হয়তো এক্ষেত্রে টয়েনবির মন্তব্য (মানুষের মধ্যে স্বশাসনের ক্ষমতা) সত্যসন্ধানে অপরিহার্য নয়। তবে সত্যিই ভয় লাগে দেশে দেশে গণহত্যার খবর পেয়ে। সভ্যতা যতই এগিয়ে চলেছে মানুষ ততই যেন হৃদয়ধর্মকে বিসর্জন দিয়ে চলছে। তবে এই জন্যই ধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়। অবশ্য বৈদিক ধর্ম আজকের দিনে কতটা প্রাসঙ্গিক, তা নিয়ে মনে প্রশ্ন জাগে। বৈদিক ধর্মের অবক্ষয়ের কথা আমরা জানি। একদিন সেজন্যই ভারতবর্ষে পৌরাণিক ধর্মের প্রসার ঘটে। আদিযুগে মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস অপরিবর্তিত থাকেনি। ধর্মের সঙ্গে মানুষের আত্মপ্রীতি জড়িয়ে আছে। হয়তো এই থেকে জন্ম নিয়েছে আধুনিক বিজ্ঞান। আসলে ধর্ম ও বিজ্ঞানের মধ্যে আমরা যে অসেতুসম্ভব দূরত্ব কল্পনা করি, তা সম্ভবত সত্য নয়। দার্শনিক প্রত্যয় নিয়ে অমিয় বন্দ্যোপাধ্যায় তাই জানিয়েছেন, "আধ্যাত্মিকতার উন্মেষ ঘটলে বিজ্ঞানীর ‍‘deeply religious non believer‍’ হয়ে, ভাববাদীদের সঙ্গে একাসনে বসতে অসুবিধা হয় না।"

তবে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য ধর্মভাবনার মধ্যে সুষ্পষ্ট প্রভেদ আছে। প্রাচ্য দর্শনের নির্দশন মেলে হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন দর্শনে। এর সঙ্গে চৈনিক দর্শন তথা লাওৎসে কনফুসিয়াসের ভাবনা যুক্ত হতে পারে। এর পাশে টলস্টয়কে ঠিক প্রথাগতভাবে দার্শনিক বলা যায় না, তবে জীবনসত্যের ব্যাখ্যায় ন্যায়-অন্যায়, যুক্তি-অযুক্তির কথা আসবেই। সেখানে দর্শন-জিজ্ঞাসায় অমিলের মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া সম্ভব। আবার যুক্তিবাদী দর্শন অনেক দূর পর্যন্ত পথ দেখাতে সক্ষম হলেও শেষ কথা বলতে পারে না। ধর্ম, ধার্মিকতা, আধ্যাত্মিকতা‍— শব্দগুলি আমরা অনেক সময়ে সমার্থক বিবেচনা করি। অথচ ধর্ম নিয়ে বিভেদের অন্ত নেই। ধার্মিকতা কখনও ধর্মের নামে ভণ্ডামিতে পর্যবসিত। আধ্যাত্মিকতার সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার কোনো সম্পর্ক নেই। ধর্মের উত্থানে ধর্মগুরুদের বিশিষ্ট ভূমিকা আছে। বিশেষ ধর্মগুরুর সঙ্গে বিশেষ ধর্মের যোগ থাকতে পারে। খ্রিস্টের নামে খ্রিস্টধর্ম, বুদ্ধের নামে বৌদ্ধধর্মের কথা বলা হয়। কিন্তু ধর্ম কোনো ধর্মগুরুর সৃষ্টি নয়। ধর্মের ইতিহাস সুপ্রাচীন। সব ধর্মের মধ্যে কতকগুলি মূল ঐক্যসূত্র আছে। অমিয় বন্দ্যোপাধ্যায় বিভিন্ন ধর্মের ইতিহাস আলোচনা করার সময়ে প্রত্যেকটি ধর্মের স্বাতন্ত্র্য ও উৎসগত সাদৃশ্যের কথা বলেছেন। সেদিক থেকে তাঁর অভিসন্দর্ভটিকে তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের প্রস্তাবনা বলা যেতে পারে। আবার তাঁর রচনাকে Encyclopedia of Religion বললে ভুল হয় না। এজন্য তাঁকে পড়তে হয়েছে বিস্তর, যদিও বিদ্যাবত্তা প্রদর্শনের জন্য তিনি বইটি লেখেননি। তিনি যাবতীয় তত্ত্ব ও তথ্য আত্মস্থ করে তা থেকে ধর্মের সারসত্যে পৌঁছেছেন। সেদিক থেকে তাঁর বইটি ধর্মের ইতিহাস হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু তিনি ইতিহাস লিখতে চাননি। আসলে তাঁর বই হয়ে উঠেছে ইতিহাসের দর্শন।

ইউরোপে রেনেসাঁসের কালে ধর্মের মানুষের পরিবর্তে মানুষের ধর্ম প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ভারতবর্ষে সনাতন ধর্ম হিসেবে হিন্দুধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলা হয়েছে। রামমোহন রায় যখন বলেন, ‍‘‍‘হিন্দুরা যে দেশেতে প্রচুররূপে বাস করেন তাহাকে হিন্দোস্থান কহা যায়।‍’‍’ তখন তিনি জানতেন ভারতবর্ষে নানা সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করে এবং তাঁদের মধ্যে ‍‘‍‘সহস্র সহস্র লোক ব্রহ্মোপাসক এবং ব্রহ্মবিদ্যার উপদেশকর্তা আছেন।‍’‍’ তবে রামমোহন বেদের প্রমাণ এবং মহর্ষির বিবরণ আর আচার্যের ব্যাখ্যা সব মানলেও তিনি তো সত্যিই ‍‘ভক্তজ্ঞানী‍’ ছিলেন না, ফলে তাঁর কাছে শেষ পর্যন্ত ‍‘‍‘বুদ্ধির বিবেচনায়-এ সকলেতে যাহার শ্রদ্ধা নাই তাহার নিকট শাস্ত্র এবং যুক্তি এ দুই অক্ষম হয়েন।‍’‍’ কিন্তু রেনেসাঁসের কালে শাস্ত্র-বিচারে বুদ্ধি ও যুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য। ধর্ম ও ধার্মিকতার প্রভেদ রামমোহনের ভালোই জানা ছিল, আর তাই বেদান্তের আলোচনায় তিনি এমন আখ্যানের অবতারণা করতে পারেন-‍‘‍‘যে কোনো ব্যক্তি আচারের দ্বারা ঋষির ন্যায় আপনাকে দেখান এবং ঋষিদের ন্যায় বেশ ধারণ করেন, আপনি সর্ব্বদা অনাচারীর নিন্দা করেন অথচ যাহাকে ম্লেচ্ছ কহেন তাহার গুরু এবং নিয়ত সহবাসী হয়েন আর গোপনে নানাবিধ আচরণ করেন আর অন্য এক ব্যক্তি অধম বর্ণের ন্যায় বেশ রাখে আমিষাদি স্পষ্ট ভোজন করে আপনাকে কোনো মতো সাচারী না দেখায় যে দোষ তাহার আছে তাহা অঙ্গীকার করে এ দুই প্রকার মনুষ্যের মধ্যে বকধূর্ত আখ্যান কাহাকে শোভা পায়।‍’‍’ বেশ বোঝা যায় লোকে যাকে সাধুপুরুষ বলে, তিনি অসাধু হতে পারেন, আবার লোকে যাকে অসাধু বলে তিনিও সাধু হতে পারেন। রামমোহনের পরের যুগে বঙ্কিমচন্দ্রের আবির্ভাব। শাস্ত্রবিচারে রামমোহন ও বঙ্কিমচন্দ্র দু'জন একই শ্লোক ব্যবহার করেছেন-

কেবলং শাস্ত্রমাশ্রিত্য ন কর্ত্তব্যো বিনির্ণয়ঃ।

যুক্তিহীন বিচারে তু ধর্ম্মহানি প্রজায়তে।।

যুক্তিহীন বিচারের হাত থেকে ধর্মকে উদ্ধারের প্রয়াস উনিশ শতকে বাংলার রেনেসাঁসে দেখা গেছে। রামমোহনের ব্রাহ্মধর্ম বঙ্কিমচন্দ্র গ্রহণ করেননি। কিন্তু তিনিও রামমোহনের মতো দু’জন হিন্দুর দৃষ্টান্ত গ্রহণ করেছেন, ‍‘‍‘আমরা একটি জমিদার দেখিয়াছি। তিনি জাতিতে ব্রাহ্মণ এবং অত্যন্ত হিন্দু। তিনি অতি প্রত্যুষে গাত্রোত্থান করিয়া কি শীত কি বর্ষা প্রত্যহ প্রাতঃস্নান করেন এবং তখনই পূজাহ্নিকে  বসিয়া বেলা আড়াই প্রহর পর্যন্ত অনন্যমনে তাহাতে নিযুক্ত থাকেন। পূজাহ্নিকের কিছুমাত্র বিঘ্ন হইলে, মাথায় বজ্রঘাত হইল মনে করেন। তারপর অপরাহ্নে নিরামিষ শাকান্ন ভোজন করিয়া একাহারে থাকেন, ভোজনান্তে জমিদারী কার্যে বসেন। তখন কোন্ প্রজার সর্ব্বনাশ করিবেন, কোন অনাথা বিধবার সর্ব্বস্ব কাড়িয়া লইবেন, কাহার ঋণ ফাঁকি দিবেন, মিথ্যা জাল করিয়া কাহাকে বিনাপরাধে জেলে দিতে হইবে, পাণ্ডুলিপি দেখতে হবে কোন্ মোকদ্দমার কি মিথ্যা প্রমাণ প্রস্তুত করিতে হইবে, ইহাতেই তাঁহার চিত্ত নিবিষ্ট থাকে, এবং যত্ন পর্যাপ্ত হয়।‍’‍’

অন্যদিকে আর একজন হিন্দু‍—‍‘‍‘তাঁহার অভক্ষ্য প্রায় কিছুই নাই। যাহা অস্বাস্থ্যকর, তাহা ভিন্ন সকলই খান। এবং ব্রাহ্মণ হইয়া এক আধটু সুরাপান পর্যন্ত করিয়া থাকেন। যে কোন জাতির অন্ন গ্রহণ করেন। যবন ও ম্লেচ্ছের সঙ্গে একত্র ভোজনে কোন আপত্তি করেন না। সন্ধ্যা আহ্নিক ক্রিয়াকর্ম কিছুই করেন না। কিন্তু কখন মিথ্যা কথা কহেন না। ... নিষ্কাম হইয়া দান ও পরহিত সাধন করিয়া থাকেন। যথাসাধ্য ইন্দ্রিয় সংযম করেন এবং অন্তরে ঈশ্বরকে ভক্তি করেন। কাহাকে বঞ্চনা করেন না, কখন পরস্ব কামনা করেন না।... হিন্দু ধর্মানুসারে গুরুজনে ভক্তি, পুত্র কলত্রাদির সস্নেহ প্রতিপালন, পশুর প্রতি দয়া করিয়া থাকেন। তিনি অক্রোধ ও ক্ষমাশীল।‍’‍’ এখন ‍‘‍‘‍এই দুই ব্যক্তির মধ্যে কে হিন্দু?‍’‍’ ধর্মতত্ত্ব ও কৃষ্ণচরিত্র বইতে বঙ্কিমচন্দ্র অনুসৃত ও ব্যাখ্যাত হিন্দুধর্মের ব্যাখ্যা আছে। তিনি হিন্দুধর্মের মধ্যে যা কিছু ‍‘‍‘আবর্জনা‍’‍’ ও ‍‘‍‘বখামি‍’‍’ বিবেচনা করেছেন, তা তিনি ঝেঁটিয়ে বিদায় করেছেন। অর্থাৎ তাঁর কাছে ধর্মের মানুষ হল ‍‘‍‘যে কেবল লোকের দ্বেষ করে, লোকের অনিষ্ট করে, পরের সঙ্গে বিবাদ করে, লোকের কেবল জাতি মারিতেই ব্যস্ত, তাহার গলায় গোচ্ছা করা পৈতা, কপালে কপালজোড়া ফোঁটা, মাথায় টিকি এবং গায়ে নামাবলি ও মুখে হরিনাম থাকিলেও, তাহাকে হিন্দু বলিব না। সে ম্লেচ্ছের অধিক ম্লেচ্ছ, তাহার সংস্পর্শে থাকিলেও হিন্দুর হিন্দুয়ানি যায়।‍’‍’

রবীন্দ্রনাথ পিতার কাছ থেকে ব্রাহ্মধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তো পানুবাবু নন, বরং তাঁকে পরেশবাবুর সঙ্গে তুলনা করা যায়। রবীন্দ্রনাথ একদিকে বলবেন মন্দিরে অলংকার শোভিত ‍‘‍‘খেলার দেবতা এই সব সোনা জহরৎকে ব্যর্থ করে বসে থাকুন‍— এদিকে সত্যকার দেবতা সত্যকার মানুষের কঙ্কালশীর্ণ হাতের মুষ্টি প্রসারিত করে ঐ মন্দিরে পথে পথে ফিরবেন।‍’‍’ অন্যদিকে ‍‘‍‘আমার ভগবান মানুষের যা শ্রেষ্ঠ তাই নিয়ে। তিনি মানুষের স্বর্গেই বাস করেন। ... যেখানে জ্ঞানে ভাবে কর্মে পরিপূর্ণ শ্রেষ্ঠতা সেইখানেই তাঁকে উপলব্ধি না করলে ঠকতে হবে।‍’‍’ মন্দির, আরাধনা, উপাসনার কোনো প্রয়োজন নেই এমন কথা রবীন্দ্রনাথ বলেন না। এখানে ধার্মিকতা আর আধ্যাত্মিকতার পার্থক্য স্পষ্ট। রবীন্দ্রনাথ হিন্দুধর্ম, এমনকি ব্রাহ্মধর্মকে পরিত্যাগ করতে সম্মত ছিলেন। ধর্মের নামে কত পাপ জমা হয়েছে এই পৃথিবীতে তা তিনি জানেন। পঁয়ষট্টি বছর বয়সে অনেক অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পর রবীন্দ্রনাথ অদ্ব্যর্থ ভাষায় ধর্মাচারকে অভিসম্পাত দিয়েছেন‍—

হে ধর্মরাজ, ধর্মবিকার নাশি

ধর্মমূঢ়জনেরে বাঁচাও আসি

যে পূজার বেদি রক্তে গিয়াছে ভেসে

ভাঙো ভাঙো, আজি ভাঙো তারে নিঃশেষে‍—‍

ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো,

এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো।

ধর্মের মানুষ হল সেই ‍‘‍‘বুদ্ধির বর্বরতা‍’‍’ যাতে ‍‘‍‘বৃহৎকালে সর্বজনীন মন আপনার সায় পায় না।‍’‍’ রবীন্দ্রনাথ বললেন, সর্বজনীন মনকে উত্তরোত্তর বিশুদ্ধ করে উপলব্ধি করাতেই মানুষের অভিব্যক্তির উৎকর্ষ। রামমোহন, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ এই মানুষের ধর্মেরই সন্ধান করেছেন। শ্রী অমিয় বন্দ্যোপাধ্যায় ‍‘‍‘ধর্মের মানুষ, মানুষের ধর্ম‍’‍’ নিবন্ধে সমাজ-ইতিহাস-দর্শনের পটভূমিতে ‍‘‍‘বৃহৎ মানুষ অন্তরের মানুষ‍’‍’-কে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রবীণ বয়সে অসুস্থ শরীরে তিনি এক অসাধ্যসাধন করেছেন। ভগবান, তিনি হয়তো এক বস্তু-অবিচ্ছিন্ন তত্ত্বমাত্র নন। তিনি মানুষের মধ্যেই ধরা আছেন। অমিয় বন্দ্যোপাধ্যায় সেই অমূর্ত জ্যোতির্ময় পুরুষকে প্রত্যক্ষ করেছেন ‍‘‍‘মনের মানুষে আমার অন্তরতম আনন্দে।‍’‍’ তাঁর কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার অন্ত নেই।

-by Aloke Roy


ধর্মের মানুষ, মানুষের ধর্ম’ গবেষণাগ্রন্থ সম্পর্কে দু’চার কথা

-শিশির কুমার মাইতি 

‘ধর্মের মানুষ, মানুষের ধর্ম’—বইটির সূচিপত্র পড়ে মনে হয়েছে লেখক অমিয় বন্দ্যোপাধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ স্তরের জন্য একটা গবেষণাপত্র রচনা করেছেন। এই বই পড়ে হজম করার মানুষ কম। লেখক মনের আনন্দে তথ্য ও তত্ত্বের বিপুল সমাবেশ করেছেন, যুক্তি-তর্কের ফাঁকফোকর কম, সর্বকালীন মানুষের জয়যাত্রার কথাই প্রাধান্য পেয়েছে।

ঈশ্বরের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ। তাকে মননসমৃদ্ধ জীবে উন্নত করার আত্মিক প্রচেষ্টা ছিল তাঁর। মানুষের জীবনোপযোগী মাতৃসমা প্রকৃতিকে তার কাছে এনে দিয়েছিলেন। সেই মানুষ যতদিন একলা ছিল সমস্যা হয়নি, যেই তার সঙ্গী জুটল, সে স্বর্গচ্যুত হয়ে মর্ত্যবাসী হয়ে কট্টর বাস্তবের মুখোমুখি হয়। প্রকৃতির কোলেপিঠে মানুষ হলেও চিরস্থায়ী জীবনের অধিকার তার নেই। একটা নির্দিষ্ট সময় সে প্রকৃতির সবকিছু উপভোগ করতে পারবে। এতে বুদ্ধিমান মানবকুল খুশি, সে নিজে সমাজ তৈরি করে নিজের মতো বেঁচে উঠে যে সভ্যতা গড়ে তুলেছে তাতে বিশ্বস্রষ্টার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। অমরত্ব আর স্থায়িত্ব ছাড়া—জঙ্গমত্ব, মানবত্ব, দেবত্ব আপন কর্মবলে স্বোপার্জিত। মৃত্যুকে সে পরোয়া করে না, আপন সৃষ্টি মধ্যেই সে অমরত্ব লাভ করতে চায়।

জীবের আবির্ভাব, ইউফ্রেটিস নদীর নিম্ন উপত্যকায় সুমেরিয়ানরা যে মানব-সভ্যতার বিকাশ ঘটায় সেটি যুগে যুগে বিভিন্ন স্থানে সমাজে, রাষ্ট্রে বিস্তৃতি ঘটেছে। প্রকৃতির ভয়ংকরত্বের মধ্যে দেবদেবীর সন্ধান ও তাদের সন্তুষ্টির জন্যে প্রিস্ট গোষ্ঠীর উদ্ভব, বিভিন্ন বিধিবিধান, বহু দেবদেবীর বাহুল্যভরা উপচার, আহুতির নামে বহু সামগ্রীর সঙ্গে জীবজন্তু এমনকী মানুষকেও আগুনে কখনও বলি দিয়ে আহুতি দেওয়া হত। বংশানুক্রমিক পুরোহিত গোষ্ঠীর একাধিপত্য রাজতন্ত্র গড়ে উঠলেও কমল না। বহু দেশ আবিষ্কার হয়েছে, সভ্যতার বিস্তৃতি ঘটেছে। শিক্ষার বিস্তার হয়েছে। ধর্ম শব্দটিকে মানুষ ব্যবহার করেছে। বিভিন্ন রীতিনীতিতে ধর্ম স্থান করে নিয়েছে। পুরোহিত গোষ্ঠীর দাপট অব্যাহত থেকেছে। ধর্মবেত্তার জন্ম, সমর্থন ও বিরোধীদের আচরণ প্রসঙ্গে লেখক স্থানে স্থানে উদ্ধৃতি দেওয়ায় পড়তে পড়তে বেশ চমক লেগেছে। নতুন তথ্যের সন্ধান মিলেছে। মানুষের ধর্মের মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষের সন্ধানের জন্যে বহু বিস্তৃত পথে লেখক পরিভ্রমণ করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ মানুষের ধর্মে জ্যোতির্ময় মানুষকে সর্বজনীনতার মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন। জীবের মধ্যে শিবের অস্তিত্বের কথা শিকাগোতে স্বামীজি বলেছেন ১৮৯৩-তে আর ১৯৩০ সালে রবীন্দ্রনাথ লন্ডনে। সংস্কারের স্বার্থান্বেষী বেড়াজালে মানুষকে বেঁধে মানুষের হিতসাধনের বদলে সাধারণ মানুষের বিপুল ক্ষতি, অহিতসাধন হয়েছে। ভারতের দুই মনীষী ইউরোপ এবং আমেরিকার ভোগলোলুপ মানুষদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন, যে বিধান রীতিনীতি সাধারণ মানুষের জীবনসঙ্গী হয় না তা ধর্ম নয়, ধর্মের নামে থিমটি গেঁথে ধর্মসরোবর থেকে তুলে হতচেতন মানুষ বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছে তারা কত বড় ধর্মবেত্তা! সাধারণ মানুষ ‘হৃদয়ে সন্নিবিষ্ট’ না হলে ধর্মোপাসনার কোনো অধিকার ধর্মবেত্তার নেই। অসীম সত্তার উপাসনা ব্যতীত অখণ্ড মানবচেতনাকে উপলব্ধি করা যাবে না।

লেখক বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ধর্মবোধের উৎপত্তি এবং ধর্মবেত্তাদের মানসিকতার দীর্ঘ বিবরণ দিয়েছেন। ধর্মপালনের মাধ্যমে মানুষের প্রাপ্তি কতখানি আর ধর্মবেত্তার ধর্ম না মানলে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে মানুষ বুঝেছিল, মেকি ধর্মবেত্তাদের স্বার্থান্বেষী ধর্মীয় কার্যকলাপ আসলে ব্যক্তিস্বার্থ পূরণের জিগির, জেহাদ তা পোপের ইনডালজেন্স আদায়, হেস্টিংসটা-হোর্সার দিনে লাল পট্টবস্ত্র-গোঁফদাড়ি রেখে যিশুভক্তি আর রাতে ডাকাতি করে নরহত্যা ঘটানোকালে হঠাৎ গ্রেপ্তার হলে সাধারণ ইউরোপবাসীর সুদীর্ঘকালীন বিশ্বাসের পারদ নেমে যায়। নেমে যায় সেন্ট পিটার্সবার্গের গির্জা নির্মাণের নাম করে মাত্রাছাড়া উৎকোচ গ্রহণের অভিপ্রায় দেখে। প্রিস্টদের অধর্মের বিপক্ষে রুখে দাঁড়িয়ে মার্টিন লুথার, জুয়েনলি ক্যালভিন, জন নক্স মৃত্যুভয় পরোয়া না করে খ্রিস্টান জনমণ্ডলীকে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, মানুষের যেখানে কল্যাণ নেই সেখানে ধর্ম বা ধর্মবেত্তার কোনো প্রয়োজন নেই। খ্রিস্টান সমাজজীবন দু’টুকরো হয়েছিল। রাশিয়া, জাপান, পারস্য প্রভৃতি দেশ পরিভ্রমণ করে রবীন্দ্রনাথ দেখেছিলেন, বংশ নয়, শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে ধর্মবেত্তা হওয়ার অধিকার অর্জন করতে হবে। এ বোধ বিশ্বের সর্বত্র হয়নি।

একদিন আমাদের এই বঙ্গদেশে ধর্মের লেবেল সেঁটে সামন্ত রাজারা— মেদিনীপুর, কোচবিহার, বর্ধমান—কালিকা পুরাণের অমৃতবাণী হৃদয়ে হজম করে গরিব, দুঃস্থ, অসহায় তরুণদের নির্মমভাবে বলি দিয়ে চিত্তশুদ্ধি করত। কোনো কুলীন পরিবারের সন্তান নয়, গরিব হত্যা, খুনের জেহাদ কী মারাত্মক মানবঘাতী ছিল তার উদাহরণ কোচবিহারের রাজা নরনারায়ণ ভূপ কালীপুজোর রাতে দেড়শো তরুণকে বলি দিয়ে চিত্তশুদ্ধি করতেন। কালিকাপুরাণের ধর্মবেত্তা আর তাদের দোসর বাংলার এইসব শক্তিশালী সামন্ত রাজাদের নরঘাতী কার্যকলাপ হিন্দুধর্মকে কলুষিত করেছে। লুথার-কেলভিনের মতো জগৎপ্লাবী ক্ষমতা না থাকলেও রামমোহন বেনথামের শিষ্য বেন্টিঙ্ককে দিয়ে নরবলি বন্ধ করিয়ে হিন্দুসমাজবেত্তাদের কম ধাক্কা দেননি। বলিপ্রথার বীভৎসতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ১৮৮৭ সালে ‘রাজর্ষি উপন্যাস লিখে হিন্দুসমাজকে সচেতন করতে চাইলেও মিশনের শিক্ষিত সংস্কারমুক্ত মানুষ বলিপ্রথা বন্ধ করলেও, রক্ষণশীল পরিবার আজও চিত্তশুদ্ধির নামে বলিপ্রথাকে টিকিয়ে রেখে একশ্রেণির মানুষের স্বার্থকে তোষণ করে চলেছে। ধর্মের এই সব মানুষদের জন্যই মানবধর্ম দলিত, মথিত, পদপিষ্ট হয়ে সাধারণ মানুষের বিপুল ক্ষতিসাধন করেছে, প্রাচীন-মধ্যযুগের সংস্কারপ্রবণ শাসকরা যদি ধর্মোন্মাদদের শক্ত শাসনের দড়িতে বাঁধতে পারত তাহলে ধর্মজীবীদের ধর্ম নিয়ে বংশপরম্পরার মৌরসিপাট্টা প্রতিরোধ করা যেত, দুর্বল অশিক্ষিত মানুষদের প্রাণরক্ষা করা সহজ হত। রাশিয়া, জাপান, পারস্যের সংস্কারমুক্ত শাসকরা দৃঢ়হাতে ধর্মজীবীদের শাসনের বেড়িতে আবদ্ধ করতে পারায় পরিশুদ্ধ ধর্মচর্চা ও-সব দেশে হয়। ধর্মের জন্য শোষণ-নিপীড়ন, নির্যাতন, মৃত্যুর কথা শোনা যায় না।

‘‘ধর্ম শব্দের অর্থ স্বভাব। চেষ্টা ক’রে সাধনা ক’রে স্বভাবকে পাওয়া, কথাটা শোনায় স্ববিরোধী অর্থাৎ স্বভাবকে অতিক্রম করে স্বভাবকে পাওয়া। খ্রিস্টানশাস্ত্রে মানুষের স্বভাবকে নিন্দা করেছে; বলেছে তার আদিতেই পাপ, অবাধ্যতা। ভারতীয় শাস্ত্রেও আপনার সত্য পাবার জন্য স্বভাবকে অস্বীকার করতে বলে। মানুষ নিজে সহজে যা, তাকে শ্রদ্ধা করে না। মানুষ বলে বসল তার সহজ স্বভাবের চেয়ে তার সাধনার স্বভাব সত্য। একটা স্বভাব তার নিজেকে নিয়ে আর একটা স্বভাব তার ভূমাকে নিয়ে।’’ —রবীন্দ্রনাথ। মানুষের ধর্ম, পৃ:৩০। মানুষের স্বভাবে ভালো-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, শ্রেয়-প্রেয়— দু’দিকই আছে। প্রকৃত জ্ঞানীব্যক্তি, ধীরোদাত্ত, সাধু মানুষ শ্রেয় গ্রহণ করেন। তার জন্যে চাই অর্জিত শিক্ষা, জ্ঞান, আত্মসমীক্ষা করার শক্তি। মনুষ্য জীবনে শিক্ষাবিস্তার হয়নি বলে মানবজাতির মধ্যে সর্বপ্রকার সমস্যা এবং সংকট এত তীব্র। রাজতন্ত্র সামন্ততন্ত্র, গণতন্ত্র বা সাধারণতন্ত্র কোথাও সর্বজনীন সর্বস্তরের প্রকৃত জ্ঞানদায়ী, প্রগতিশীল শিক্ষাবিস্তারে অগ্রণী হয়নি বলেই মনুষ্যজীবনে এত সমস্যা। শাসকশ্রেণি জানত, শিক্ষালাভ যত সম্প্রসারিত হবে তাদের শাসন ততই সীমিত হবে। অতএব মানুষকে অন্ধকারে রাখার অপচেষ্টা আবহমানকাল ধরেই চলে এসেছে। এখনও যে শাসকের এই শুভবুদ্ধি হয়েছে তা মনে করা ঠিক হবে না। অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের পরেই যে শিক্ষার রাজকীয় স্থান থাকা উচিত, সেই শুভবোধের জাগরণ সুদীর্ঘকাল হয়নি। দেশে-বিদেশে কত আন্দোলন, কত মতাদর্শ, কত ধর্মীয় মতবাদ ও দর্শন— মনুষ্য জীবন থেকে শোষণের মানসিকতা, মাৎস্যন্যায়কে মুছে দিতে পারেনি। একা বাংলাদেশে এত মহাপুরুষ, এত ধর্মমত, এত ধর্মীয় আন্দোলন, কিন্তু সাধারণ মানুষ, সমাজের নীচের মানুষ আর্যযুগে যেখানে ছিল আজও হয়তো তত নীচে নেই, কিন্তু বিশ্বের সকল শ্রেণির মানুষ কী পূর্ণ মানুষ হয়ে উঠেছে? যতক্ষণ না, যতদিন না সর্ব শুভঙ্করী সর্বজনীন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ্যার উন্মুক্ত দ্বার উদার হস্ত সর্বত্র প্রসারিত হবে, মানুষের মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটবে না। জাপান, রাশিয়া অনেকটাই পেরেছে, তাই ওসব দেশে মানুষ মুক্তির আলোয় আলোকিত হয়েছে।

নিরাকার একেশ্বর বিশ্বাসীদের নিয়ে রামমোহন রায় ১৮২৮ সালে ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রাহ্ম বলতে বেদান্ত প্রতিপাদ্য সত্যধর্মের পূজারি এবং ব্রাহ্মধর্ম ছিল বিশ্বজনীন সত্যধর্ম। যা শিক্ষিত বাঙালিদের হৃদয় আকর্ষণ করে। ‘প্রতিমাদিতে পরমেশ্বর উপাসনা নয়’ এই মতবাদ নিয়ে তাঁরা ব্রাহ্মসমাজের উপাসনা মন্দির গড়ে তোলেন আপার চিৎপুর রোডে। বিলেতে রামমোহনের মৃত্যুর পর ব্রাহ্মসমাজের দায়িত্ব নেন দেবেন্দ্রনাথ। যুক্তিবাদের ওপর ভিত্তি করে তত্ত্ববোধিনী সভা, পাঠশালা, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা, বৈজ্ঞানিক যুক্তিবাদ প্রতিষ্ঠা— অন্ধ শাস্ত্রানুসরণ নয়, ঈশ্বরাদেশ পালন করার জন্য দীক্ষাগ্রহণ প্রথা প্রবর্তিত হওয়াতে নারীশিক্ষা, জাতিভেদ প্রথা রদ, বাল্যবিবাহ রদ, উদারনৈতিক ধর্মীয় মতাদর্শে আকৃষ্ট হওয়ায় বিপুলভাবে মানুষ উপকৃত হলেও সমাজের রক্ষণশীল অংশের সঙ্গে মতবিরোধ হওয়ায় কেশবচন্দ্র সেন ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ মেছুয়াবাজার স্ট্রিটে ১৮৬৯ সালে ব্রাহ্মমন্দির গড়ে তোলেন। তাঁর ব্যক্তিত্বে ও বাগ্মিতায় ব্রাহ্ম আন্দোলনে যুব সমাজের মধ্যে নতুন প্রাণচাঞ্চল্য ও আলোড়ন সৃষ্টি হয়। পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, মাদ্রাজ, বোম্বাইয়ে ব্রাহ্মসমাজ স্থাপিত হয়। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে ব্রাহ্মসমাজ সেবাদল গঠন করে উল্লেখ্য ভুমিকা পালন করে। শিক্ষাবিস্তার, নারীসমাজের উন্নয়ন, অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ, স্বধীনতা আন্দোলন, অসবর্ণ বিবাহ প্রবর্তন, কুসংস্কার, কুপ্রথা ও আচরণ বিধির বিরুদ্ধে সংগ্রাম, সামন্ততান্ত্রিক ভাবধারার বদলে পাশ্চাত্যের উদারনৈতিক চিন্তার প্রবর্তন, সমাজে নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা, উচ্চশিক্ষা বিস্তার, দেশীয় সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন- ঊনবিংশ শতকের বাংলার নবজাগরণের ইতিহাসে ব্রাহ্মসমাজের আন্দোলনে বাংলার মনুষ্যজীবন এই প্রথম নতুন প্রাণের আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠেছিল। এই প্রথম মধ্যবিত্ত শ্রেণি বাঁচার নতুন সামাজিক পরিমণ্ডল পায়।

হিন্দু-সমাজজীবনে সুদীর্ঘকালের  অশিক্ষা, কুসংস্কারের জগদ্দল পাথর সরিয়ে নারীমুক্তি আন্দোলন, মধ্যবিত্ত জীবন কতখানি সংস্কারমুক্ত হয়েছিল, পুরোহিতন্ত্রের একচ্ছত্র প্রভাব কতখানি দমিত হয়েছিল, ব্রাহ্ম আন্দোলন মধ্যবিত্ত জীবনকে আত্মপ্রতিষ্ঠায় কতখানি পদপ্রদর্শন করেছিল, এসব প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন মাথায় রেখেও বলা যায়, হিন্দু সমাজের নরঘাতী সুদীর্ঘকালের সংস্কার, জাতিভেদ প্রথার সংস্কারপ্রবণ দিক, নারীশিক্ষা ও নারী-প্রগতির ক্ষেত্রে এই প্রথম হিন্দুজাতি বাঁচার অভয় মন্ত্র শুনেছিল। রামমোহন, দেবেন্দ্রনাথ, কেশবচন্দ্র সেন, আনন্দমোহন বসু, শিবনাথ শাস্ত্রী— ব্রাহ্ম আন্দোলনের এইসব নেতাদের জীবন ও কার্যকলাপে যুবশক্তি উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল। মহৎ জীবন, মহৎ ভাবদর্শ থাকলে মানুষ স্বাভাবিক ন্যায়, সত্য, আদর্শ পথের যাত্রী হয়। সর্বনাশা জাতিভেদ, অস্পৃশ্যতা, নারীমুক্তি—শিক্ষার দিগন্ত বিস্তার হলে আপামর সাধারণ মানুষ নতুন মুক্তির আলোয় এই প্রথম হৃদয় মেলে ধরতে পেরেছিল, এতকালের বংশকৌলীন্যের একচ্ছত্র দাপট এই প্রথম ব্রাহ্মদের কুঠারাঘাতে শতচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। শিক্ষা পেয়ে যোগ্যতার ভিত্তিতে মানুষ এই প্রথম আত্মপ্রতিষ্ঠার পথ খুঁজে পায়।

পৃথিবীতে যুগে যুগে কত ধর্ম প্রবক্তা জন্মেছেন, কত মতাদর্শ প্রচারিত হয়েছে, কিন্তু মাত্র তিন-চারটি ধর্মের কথা ছাড়া বাকিদের নাম, মতাদর্শ দলিল দস্তাবেজেই নিবদ্ধ। মানুষ যত শিক্ষিত হয়ে আত্মসচেতন হবে, তত তার জীবন থেকে ধর্মাচরণের বেড়ি ক্রমশই খুলে যাবে। ধর্ম-কাজের নামে অলস জীবন-যাপনের মোহ মুছে যাবে। আসলে মানুষের হাতের কাজ, দায়-দায়িত্ব পালনের ঝক্কি থাকলে ঠাকুর-দেবতার মূর্তি বা ছবি নিয়ে পুতুল খেলার প্রবণতা থাকবে না। ছোটবেলায় বহু ধর্মীয় মণ্ডপে, আখড়ায়, মজলিশের আড্ডা দেখেছি, এখন সেগুলো ভেঙে বসতি গড়ে উঠতে দেখছি। সেই গোড়ায় গলদ! এতদিন মানুষকে লেখাপড়ার গুরুত্ব মানবজীবনে কত বড় তা বোঝানো হয়নি বলেই মানুষের চিন্তা-চেতনায় প্রাণশক্তির জোয়ার আসেনি। সমাজজীবন থেকে সামন্ত-জমিদার মুছে গেছে, এখন নিজের অন্ন নিজেকে খুঁজে নিতে হবে। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মানুষ জীবন-সত্য অনুধাবন করেছে। সত্যধর্ম পালনের আদর্শ সমাজজীবনকে কলুষমুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। জীবধর্ম পালনের মাধ্যমে মনুষ্যধর্ম পালনের ব্রত পালিত হয়। ধর্ম হচ্ছে সত্যানুসন্ধান। যে মতাদর্শ মানবতা-বিরোধী তা নরঘাতী, যে ধর্মবোধের মধ্যে স্বার্থান্বেষী পুরোহিত শ্রেণিপুষ্ট বিধিবিধান তা সর্বাগ্রেই পরিত্যাজ্য। যার মধ্যে গোঁড়ামি, সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি আছে সেই ধর্মতন্ত্র মানবতাবিরোধী, মানবপ্রগতির পরিপন্থী।

রবীন্দ্রনাথ এই ধর্মতন্ত্রকে ধিক্কার দিয়ে লিখেছেন :

‘‘হে ধর্মরাজ ধর্মবিকার নাশি

ধর্মমূঢ়জনেরে বাঁচাও আসি।

যে পূজার বেদি রক্তে গিয়েছে ভেসে।

ভাঙো ভাঙো, আজি ভাঙো তারে নিঃশেষে—

ধর্মকারার প্রাচীরে বজ্র হানো

এ অভাগা দেশে জ্ঞানের আলোক আনো।’’

বিশ্বের বিভিন্ন ধর্মবেত্তা, ধর্মীয় দর্শন, প্রচারের প্রভাবে মানুষের জীবন কেমনভাবে বিবর্তিত  হয়েছে এই বইয়ে তার বিস্তৃত বিবরণ দিয়েছেন লেখক। ধর্মবেত্তাগণ শুধু ধর্মীয় শিক্ষা, নীতি-শিক্ষা দিয়ে তাঁদের মতাদর্শের অনুসারী করে তুলতে চেয়েছেন। মানুষের মন স্বভাবগুণে চঞ্চল; ধর্মমত ধর্মের মাহাত্ম্যে সাময়িক চিত্তকে বাঁধতে পারে। চিরস্থায়ী ফল পেতে হলে সুদীর্ঘকালীন প্রচেষ্টা প্রয়োজন। ধর্মবেত্তাগণের চিন্তাধারায় এ মানসিকতা কেন মনে স্থান পেল না, সেটাই ভাবার বিষয়। জন্ম থেকে সর্বস্তরে প্রাথমিক শিক্ষালাভ হলে বিশ্বের সর্বাধিক মানুষ যে ধর্মসংঘাতে মৃত্যুবরণ করেছে তা হয়তো করতে হত না। শিক্ষা যার সমান্যও নেই তাকে ধর্মীয় তত্ত্ব গজাল মেরে মাথায় ঢোকালে সেটা স্ক্রু হয়ে বেরিয়ে এসে অপরকে বিঁধে বিপত্তি ঘটাবে। মানুষকে নিরক্ষর, কুসংস্কারাচ্ছন্ন করে রেখে ধর্মের অমৃত দিলে, অনভ্যাসবশত তার বদহজমে শরীরটাই বিগড়ে যাবে। ধর্ম নিয়ে রক্তক্ষয়ী দাঙ্গার মূল উৎস তো এখানেই নিবদ্ধ, গোড়ায় সার না দিয়ে বড় গাছটার গায়ে ভাবাদর্শের শান্তিবারি ঢাললে সেটি গাছের বাইরে গতর বাড়াবে, তার থেকে সুগন্ধি রজনীগন্ধা মিলবে না, মিলবে রঙবাহারি পলাশ। লৌকিক ধর্মের সর্বজনীন জনহিতৈষী রূপের অবক্ষয়ের এটিই গোড়ার কথা। ব্রাহ্মরা বুঝেছিল, কলকাতায় ব্রাহ্মদের প্রতিষ্ঠিত ছেলেমেয়েদের যে উন্নত শিক্ষাদানের আয়োজন ছিল সেই ধারা এখনও কলকাতায় দেখা যায়। অন্য ধর্মমতে বিশেষ নেই। এই গোড়ার কথাটি বিবেকানন্দ, রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ আদর্শ শিক্ষাবিদরা এদেশে প্রথম বুঝেছিলেন। গুরুর নামে মিশন তৈরি করে আশ্রমিক সন্ন্যাসী ভাইদের শিক্ষণ কাজে নিয়োগ করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন ধর্মের কাজের নামে সময় অপচয় নয়, ছেলেদের শরীরচর্চা, হাতে-কলমে কর্মশিক্ষা আর শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার গোড়ার কাজটাই করতে হবে আশ্রমিক গুরুভাইদের। এই কাজ করতে গিয়েই তিনি একদিন চাতলাতলার স্কুলের হেডমাস্টারির চাকরিটা খুইয়ে চরম দারিদ্র্যে পড়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক ছিলেন। শান্তিনিকেতনে স্কুল করে খোলা গাছের তলায় বসে শিক্ষার্থীদের নিজে পড়াতেন। মানুষের সমাজকে বাঁচাতে আগে চাই, নির্মুক্ত সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা। তবেই জাতির ভবিষ্যৎ গড়ে উঠবে। স্বশিক্ষিত মানুষ ভালো-মন্দ বিচার করতে পারে। কীসে সমাজের হিতসাধন হবে তার বিচার করতে পারবে।

এতকাল নিরক্ষরদের পেশির জোরে ধর্মের পুরিয়া গিলিয়ে যে ধর্মবিজয়ের স্বপ্ন ধর্মবেত্তারা দেখিয়েছিলেন, তার প্রভাব মাত্র চারটি সংখ্যায় এসে ঠেকেছে, যেভাবে পৃথিবী হেঁটে চলেছে এ সংখ্যাও কমবে না তা কে বলতে পারে? মানবতাবোধ, মানুষের আত্মিক শক্তি যত জাগরিত হবে ধর্মকর্মের অলস জীবনের যাত্রীসংখ্যা যে দ্রুত কমে যাবে তা বলাই বাহুল্য। জীবজগতে মানুষকে শ্রেষ্ঠত্বের পরিচয় দিতে হলে সর্বাগ্রে চাই তার চারিত্রিক শুদ্ধতা। লৌকিক ধর্মের মাধ্যমে সেটি সর্বাগ্রে সর্বত্র আহরিত হয় না। সব লৌকিক ধর্ম সর্বজনীন মানবের জন্য বিধিবদ্ধ নয়। বিশেষ বিশেষ সম্প্রদায়ের স্বার্থের কথা মনে রেখে ধর্মের অনুশাসনলিপি বিধিবদ্ধ হয়। ধর্মের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণের জন্য শতবর্ষ-বর্ষের খ্রিস্টান-মুসলিম সংঘর্ষে মৃত্যুমিছিলের ঘটনা ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায়। ক্রুশযুদ্ধ (Cross War)-র কথা বললে এখনও অনেকে ভয়ে রোমাঞ্চিত হয়।

একবিংশ শতকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং উৎপাদন—এই ত্রিচক্রযানে চড়ে মানুষ সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছতে চায়। তার জন্যে অপরকে শোষণ, নিপীড়ন, নির্যাতন করতে কুণ্ঠাবোধ নেই। আত্মপ্রতিষ্ঠার জন্য মানবধর্মকে পদদলিত করতেও মানুষের কুণ্ঠাবোধ নেই। মানুষের লোভ, আত্মসর্বস্বভাব মানুষকে পশুত্বের পর্যায়ে টেনে নিয়ে কোন অধর্মের রাজত্বের বাসিন্দা করছে তা সে পেছনে তাকিয়ে দেখতে চায় না। ধর্ম হচ্ছে একটা আবরণ, এটি পরা থাকলে সাধু বলে সামাজিক স্বীকৃতি জোটে। সৎভাব, জনকল্যাণ, মহত্বের কর্মধারার পরিচয় অল্পজনের মধ্যেই পাওয়া যায়। এখন বর্ম আর মুখোশ পরা মানুষের সংখ্যা বেশি, ব্রহ্মজ্ঞান নেই, উপবীত উপজীব্য হলেই ব্রাহ্মণ-হওয়া যায়। সৎভাব না থাকলেও তার গেরুয়া সাজ থাকলেই সাধুপদভুক্ত হওয়া যায়। এখন মানুষ নিজেকে চেনে না, মানুষের আত্মজিজ্ঞাসা নেই। আত্মধর্ম বিক্রি করে দিয়ে সংসারে নিষ্প্রাণ পুতুল সেজে নেচেকুদে ষাট-সত্তর বছরের পর শূন্য হৃদয়ে শ্মশানবাসী হয়। এই ধরনের মুমূর্ষু হতচেতন মানুষদের নিয়ে ধর্মসমাজ গড়ে তোলার প্রবণতা দেখি। কেউ বাঁচার তাগিদে, কেউ অর্থের লোভে, কেউ পদের লোভে মাতাল হয়ে নিষ্প্রাণ হৃদয়ে বেঁচে আছে, জীবন্মৃত হয়ে। ধর্ম পারিবারিক জীবন, সমাজ, বৃহত্তর দেশকেও ঐক্যবদ্ধ করে প্রাণচাঞ্চল্যে মনুষ্যজীবনকে একসূত্রে বেঁধে রাখতে পারছে না। সর্বত্র অতৃপ্তি, হিংস্র প্রতিযোগিতা ডিঙিয়ে বড় হওয়ার প্রবণতা, অথবা পেশির জোরে  সমাজের, দেশের শিরোমণি হবার জন্যে মানুষ কত হীন কাজে মেতে উঠেছে— এই পরস্পরবিরোধী দ্বন্দ্বমূলক পরিস্থিতিতে সবচেয়ে অসহায় সাধারণ মানুষ। ধর্ম তাকে আর বাঁচার আশ্রয় দিচ্ছে না, রাজনীতি তাকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে, বাঙালির বহু সাধনায় গড়া যৌথ-পরিবার ধূলিসাৎ হয়েছে, মা-বাবা আর দেবতা নয়, শিক্ষক আজ ব্যবসাদার, পূজনীয় নয়, সাহিত্য-শিল্প-সংস্কৃতির জগৎ রাজনীতিবিদ, কালোয়ার ব্যবসাদারদের বিচরণক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঘরে-বাইরে, সমাজে সর্বত্র মানুষ বড্ড একলা, নিঃসঙ্গ জীবন। নতুন প্রজন্ম ভাবে জন্মটাই অভিশাপ। ভারতবর্ষ বিশেষ করে বঙ্গজীবনে যারা একদিন দীর্ঘকালীন পরাধীনতার মধ্যে মুক্তির মন্ত্র শুনিয়ে দেশবাসীকে বাঁচিয়ে তুলেছিল, সেই বঙ্গজীবন রাজনীতি মারণরোগে পরিবার-সমাজ আক্রান্ত হয়ে হতচেতন হয়ে পড়েছে, সাহিত্য-সংস্কৃতির জগৎ অবক্ষয়ে জীর্ণ, মঠ-মন্দির গির্জা মসজিদে সরল প্রাণের বিনিময়ের মানুষ পাওয়া যায় না,— কোথাও প্রাণ নেই। চারদিকে রংমাখা মুখ আর মুখোশ ভরা নিষ্প্রাণ পুতুল নিয়ে মানুষ বেঁচে আছে। তবু জন্ম একবার যখন হয়েছে বিশ্বাস হারানোর কথা ভাবা উচিত নয়। বিশ্ববিবেকের উত্থান, জাগরণ হবেই।

রবীন্দ্রনাথ ভারতবাসীর অধঃপতনের স্বরূপ সন্ধান করে লিখেছেন,‘‘ভারতবর্ষের সকলের চেয়ে যে দুর্গতি আজ মাথা তুলে উঠেছে সে কেবল অন্ন বস্ত্র শিক্ষা এবং আরোগ্যের শোকাবহ অভাব মাত্র নয়, সে হচ্ছে ভারতবাসীর মধ্যে অতি নৃশংস আত্মবিচ্ছেদ, যার কোনো তুলনা দেখতে পাইনি ভারতবর্ষের বাইরে মুসলমান স্বায়ত্তশাসন চালিত দেশে। আমাদের বিপদ এই যে, এই দুর্গতির জন্যে আমাদেরই সমাজকে একমাত্র দায়ী করা হবে।’’ (কালান্তর, পৃঃ ১৩)। তবু দেশের প্রতি তাঁর অগাধ  ভালোবাসা আর আস্থা আছে। ‘‘আজ আশা করে আছি, পরিত্রাণকর্তার জন্মদিন আসছে আমাদের এই দারিদ্র্যলাঞ্ছিত কুটিরের মধ্যে; অপেক্ষা করে থাকব, সভ্যতার দৈববাণী সে নিয়ে আসবে, মানুষের চরম আশ্বাসের কথা মানুষকে এসে শোনাবে এই পূর্বদিগন্ত থেকেই। ...মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি নির্মল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আর-এক দিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎমর্যাদা ফিরে পাবার পথে।

ঐ মহামানব আসে,

দিকে দিকে রোমাঞ্চ লাগে

মর্তধূলির ঘাসে ঘাসে।’’

      প্রথমেই উল্লেখ করেছি বইটি একটি পাঠযোগ্য আদর্শ গবেষণাগ্রন্থ। তথ্য সংগ্রহ এবং তার যথার্থ বিন্যাস- গবেষণাপত্রের প্রারম্ভিক শর্ত; যে গবেষক পূরণ করতে পারেন, তিনি সাফল্য পান। অফুরন্ত তথ্য, তার সঙ্গে আনুষঙ্গিক উদ্ধৃতি প্রবন্ধ-পুস্তকটিকে একটি অন্য মাত্রা দিয়েছে। মুনশিয়ানা ও দক্ষতার দরাজ পরিচয় দিয়েছেন গ্রন্থকার। এই ধরনের বই লিখতে কী পড়াশোনা, চিন্তাভাবনা করতে হয়েছে তা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই জানেন। ভাগ্য ভালো, এখনকার পল্লবগ্রাহী স্বল্পপড়ুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের হাতে বিচারের জন্যে তাঁকে পড়তে হয়নি। বুড়ো বয়সে মানসিক যন্ত্রণার হাত থেকে করুণাময় ঈশ্বর তাঁকে রক্ষা করেছেন, হয়তো তাঁকে দিয়ে আরও কিছু লিখিয়ে নেবার প্রগাঢ় আস্থা তাঁর আছে! এতে পাঠকদের প্রত্যাশা পূরণ হবে।

-by Sisir Kumar Maity


 

Media Reviews


Dharmer Manush Review in Ekdin
08-Jul-2017

Saptahik Bartaman
08-Apr-2017
  © 2010 - 2016 Smriti Publishers | design by Poligon